চলচ্চিত্র নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরণের
লেখালেখি হয়। তবে ঘুরেফিরে লেখাগুলো সাধারণত তিনটি আঙ্গিকেই হয়ে থাকে। সেগুলো হল –
১. ফিল্ম রিভিউ
২. ফিল্ম ক্রিটিসিজম
৩. ফিল্ম অ্যানালাইসিস
উপরোক্ত সবকিছু নিয়ে নয়, বরং ‘ডুব’
চলচ্চিত্রের ক্রিটিসিজম বা সমালোচনা করাই আমার আলোচনার বিষয়বস্তু।
একজন
সাধারণ দর্শক হিসেবেই আমি ডুব চলচ্চিত্র নিয়ে সমালোচনা করবো। ডুব চলচ্চিত্রটি
মুক্তির আগ থেকেই সবার আগ্রহের জায়গাটি তৈরি করে নিয়েছে। মূলত দুটি বিষয় এই
আগ্রহের মূল কারণ। প্রথমত, পশ্চিম বঙ্গের দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকার সূত্রে জানা
যায়, এই চলচ্চিত্রটি বাংলাদেশের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের বায়োপিক।
দ্বিতীয়ত, এই চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন বলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা ইরফান খান।
তবে
এই চলচ্চিত্র মুক্তির আগে যতটানা দর্শকের আগ্রহ তৈরি করতে পেরেছে, মুক্তির পর তার
থেকে বেশি সমালোচিত হয়েছে।
এই
চলচ্চিত্রের গল্প খুবই সাধারণ। কিন্ত এই সাধারণ গল্পটিকে জটিল ভাবে উপস্থাপন
করেছেন পরিচালক মোস্তফা সারয়ার ফারুকী। তাই পরিচালক যে সকল শ্রেণীর দর্শককে
টার্গেট করে সিনেমাটি বানায়নি তা সহজেই অনুমান করা যায়।
ছবির
শুরুতেই দেখা যায় কলেজের রিইউনিয়নের দৃশ্য। সেখানে সাবেরি ও নিতু পাশাপাশি বসে
আছে। কিছুক্ষণ তাদের মাঝে অস্বস্তিকর কথোপকথনের পরই হটাত দেখা যায় সাবেরি ও নিতুর
শৈশব দৃশ্য। অর্থাৎ হুট করেই পরিচালক অতীতে চলে গেলেন। মূলত এভাবেই গল্প বলা শুরু
হয়। বাংলাদেশি চলচ্চিত্রে সচারচর এই ধরণের শুরু আমরা না দেখলেও, পরিচালকের গল্প
শুরু করার এই পন্থা আমার কাছে যথেষ্ট আকর্ষণীয় বলে মনে হয়েছে।
এই
চলচ্চিত্রের বেশ কয়েকটি জায়গায় একটি দৃশ্যের পর হুট করে আরেকটি দৃশ্যে চলে যায়।
অর্থাৎ কাহিনীর ধারাবাহিকতা ভেঙ্গে এক দৃশ্য থেকে লাফ দিয়ে হুট করে অন্য দৃশ্যে
চলে গেছে। পুরো চলচ্চিত্রটি জুড়েই এমন দৃশ্য চোখে পড়ার মত ছিল। যেমন সিনেমার মূল চরিত্র জাভেদ তার
দ্বিতীয় স্ত্রী নীতুকে ভালোবেসে জড়িয়ে ধরেছে, আবার পরক্ষনেই দেখা যায় পাশেরঘরে
কোরআন পাঠ অর্থাৎ জাভেদের মৃত্যু হয়েছে।
আবার
এমন কিছু দৃশ্যও দেখানো হয়েছে যার কোন বর্ণনাই পরিচালক দেননি। যেমন বান্দরবানের
একটি দৃশ্যে দেখা যায় জাভেদ তার সাবেক স্ত্রী মায়ার সাথে দেখা করার আগে তার হাতের
ঘড়িটি পানিতে ফেলে দেয়। কিন্তু কেন সে পানিতে ঘড়িটি ফেলে দিল তা পরিচালক দেখাননি।
আবার ফ্লাইওভারের আরেকটি দৃশ্যে দেখা যায় নিতু একটি গাড়ি থেকে একবার নামছে আবার
উঠছে। কিন্তু বারবার সে কেন গাড়ি থেকে উঠানামা করছে তার বর্ণনাও পরিচালক দেননি।
এরকম আরও অনেক ‘কেন’ প্রশ্নের উত্তর পরিচালক দেননি। হয়তো এই প্রশ্নের উত্তরগুলো
দর্শকের উপরেই ছেড়ে দিয়েছেন তিনি।
এবার
আসা যাক কাস্টিং নিয়ে আলোচনা। আগেই বলেছি মুক্তির আগ থেকেই সবার আগ্রহের
কেন্দ্র ছিল বলিউড অভিনেতা ইরফান খানের এই চলচ্চিত্রে অভিনয় করা নিয়ে। ‘জাভেদ
হাসান’ চরিত্রটির জন্য ইরফান খান ছিল পরিচালকের পারফেক্ট চয়েজ। তার অ্যাক্টিং
স্কিল নিয়ে কারো কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। বাংলা উচ্চারণটুকু বাদ দিলে বরাবরের মতই
তিনি ছিলেন অসাধারণ। তবে উচ্চারণের জায়গাগুলো অসাধারণ এক্সপ্রেশন দিয়েই তিনি এর
দুর্বলতাগুলো দূর করেছেন।
মোস্তফা
সারয়ার ফারুকীর সিনেমাতে অভিনেত্রী তিশা থাকবেন না, তা তো হয় না। তবে ‘সাবেরী’
চরিত্রতে তিনিও ছিলেন দুর্দান্ত। বিশেষ করে ইমোশনাল দৃশ্যগুলোতে তার অভিনয় ছিল
অসাধারণ। সিনেমার শেষ দৃশ্যে জাভেদের মরদেহের সামনে কান্নার দৃশ্যটি তিনি
চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
মায়া
চরিত্রটিও অভিনেত্রী রোকেয়া প্রাচী সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। যে ইনোসেন্ট একটা
ইম্প্রেশন ক্যারেক্টার ডিমান্ড করেছিলাম তার পুরোটাই পেয়েছি তার কাছ থেকে।
নিতু
চরিত্রটায় শুধু পার্ণো মিত্রাকে একটু দুর্বল মনে হয়েছে। তার চরিত্রটা আর একটু
স্ট্রং হলে হয়তো ভালো হতো। অবশ্য পরিচালক অল্প কিছু দৃশ্যে তাকে দেখিয়েছেন বলেই
হয়তো তার চরিত্রটি অন্য সব চরিত্রের মতো এতটা ফুটে উঠেনি।
এই
চলচ্চিত্রের সিনেমাটোগ্রাফি ছিল অসাধারণ। বান্দরবানের পাহারের দৃশ্য থেকে
শুরু করে কোলাহল পূর্ণ ঢাকা নগরীর দৃশ্যগুলো খুব সুন্দরভাবেই তুলে ধরেছেন শেখ
রাজিবুল ইসলাম। বিশেষ করে সমুদ্রে সূর্যাস্তের দৃশ্যটি ছিল চমৎকার।
সিনেমার
আবহসঙ্গীত ছিল বেশ ভালো। এর সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন পাভেল আরিন। পুরো
সিনেমাতে একটাই গান। গানের টাইমিংও ছিল পারফেক্ট। আমাদের দেশীয় সিনেমাতে গানের
সংখ্যা যেমন বেশি হয় তেমনি এর মানও সেরকম ভালো হয় না।
![]() |
| চিরকুট |
কিন্তু মিউজিক আর লিরিক্সের
জন্য চিরকুটের ‘আহারে জীবন’ গানটি বেশ ভালো লেগেছে।
১০৫
মিনিট দৈর্ঘ্যের এই চলচ্চিত্রে পরিচালক বেশ কয়েক ধরণের ক্যামেরা শট
ব্যাবহার করেছেন। ওয়াইড
শট, মিডিয়াম শট, ক্লোজআপ শট, এক্সট্রিম ক্লোজআপ শট, ওভার দ্যা ষোল্ডার শট, টু শট,
জুম-ইন ও জুম-আউট শট প্রায় সব ধরণের শট প্রয়োজন অনুসারে পরিচালক খুব সুন্দর ভাবে
নিয়েছেন। সিনেমার
শুরুতে সাবেরী ও নিতুর কথোপকথনের টু শট কিংবা আশুলিয়ায় মায়ার সাথে সাবেরীর
কথোপকথনের আবেগময় ক্লোজআপ শটটি এর অন্যতম উদাহরণ।
এছাড়া
এই চলচ্চিত্রে দৃশ্যের প্রয়োজন অনুসারে পরিচালক প্রায়শই এক্সট্রিম লং শট নিয়েছেন।
এক কথায় বলা যায় এই সিনেমাতে ক্যামেরা শটগুলো ছিল দুর্দান্ত।
সবশেষে বলা যায় ডুব চলচ্চিত্রে কাস্টিং থেকে
শুরু করে আবাহসঙ্গিত, সিনেমাটোগ্রাফি, এডিটিং কিংবা ক্যামেরার কাজ যতটা না ভালো
হয়েছে তার থেকে বেশি খারপ হয়েছে এর দুর্বল গল্প ও তার উপস্থাপনের জন্য। পরিচালক
ফারুকী যদিও বলেছেন এই সিনেমা ‘আউট অব দ্যা বক্স’ অর্থাৎ গতানুগতিক সিনেমার বাহিরের
একটি সিনেমা। কিন্তু ইরফান খান কিংবা পরিচালক মোস্তফা সারয়ার ফারুকীর কাছে দর্শকের
প্রত্যাশা থাকে সবসময়ই অনেক। পরিচালক যদিও বলছেন এটি একটি নৈশব্দের গল্প। কিন্তু
অনেক নৈশব্দের গল্পেই কোন প্রকার গান, মারামারি কিংবা রোমান্সের দৃশ্য ছাড়াই
সুন্দর ডায়ালগ কিংবা বেশি আলোচনার মাধ্যমে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু
এই সিনেমাটি সেই দিক থেকে ব্যর্থ।




কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন