এই ব্লগটি সন্ধান করুন

সোমবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

পররাষ্ট্র বিষয়ক সংবাদের জন্য পশ্চিমা সংবাদ সংস্থা ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের উপর বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের অতি নির্ভরতা

বর্তমান আধুনিক যুগে গণমাধ্যম একটি বড় শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে। দেশের অধিকাংশ মানুষ এখন তথ্য পাওয়ার জন্য গণমাধ্যমের উপর  নির্ভরশীল। আর এই নির্ভরশীলতার জন্য গণমাধ্যমও আমাদের সবকিছু শেখানোর গুরু দায়িত্ব নিয়ে ফেলেছে। কীভাবে হরেক পদের রান্না করতে হয়, পরীক্ষার জন্য কোন পড়াটা পড়তে হবে, সামনের শীতে কোন শালটা পরতে হবে, ব্যস্ততার মধ্যেও কীভাবে রূপচর্চার কাজটি চালিয়ে যেতে হবে, কীভাবে ঘর সাজাতে হবে সবকিছুর জন্যই আমারা গণমাধ্যমের উপর নির্ভরশীল হচ্ছি। শুধু তাই নয় মানুষের ভাবনার বিষয়টিও গণমাধ্যমেই ঠিক করে দিচ্ছে। কিন্তু দেশের এই গণমাধ্যমই আবার তথ্য পাওয়ার জন্য পশ্চিমা সংবাদ সংস্থা ও সংবাদমাধ্যমের উপর নির্ভরশীল হয়।

আমাদের দেশের প্রায় সকল গণমাধ্যমই আন্তর্জাতিক সংবাদের জন্য পশ্চিমা সংবাদ সংস্থা কিংবা অন্যান্য পশ্চিমা গণমাধ্যমের উপর নির্ভরশীল। দেশের সকল গণমাধ্যমের পররাষ্ট্র বিষয়ক সংবাদগুলোর শতকরা ৯৭% আসে পশ্চিমা সংবাদ সংস্থা বা গণমাধ্যম থেকে। মূলত আমাদের দেশের সংবাদমাধ্যমগুলো এসব পশ্চিমা সংবাদ সংস্থার দেওয়া তথ্যগুলোকে অনুবাদ করে কিংবা হুবহু আমাদের কাছে তুলে ধরে। তাই দেখা সাধারণ মানুষও সেই সংবাদগুলোকেই সত্য হিসেবে মেনে নেয় যা পশ্চিমারা আমাদেরকে সত্য হিসেবে দেখাতে চায়।

সমগ্র পৃথিবীতে সংবাদ সরবারাহে এপি, এএফপি, রয়টার্স  এই তিনটি সংবাদসংস্থাই মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। সংবাদসংস্থা তিনটি পশ্চিমা যথাক্রমে আমেরিকান, ফরাসি ও ব্রিটিশ। ফলে সারা পৃথিবীতে প্রায় অধিকাংশ দেশে বিশেষ করে ৩য় বিশ্বে আন্তর্জাতিক সংবাদগুলো পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গিতেই পরিবেশিত হয়।

পররাষ্ট্র বিষয়ক সংবাদের জন্য বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলো কতটা বিদেশী সংবাদ সংস্থা কিংবা সংবাদমাধ্যমের উপর নির্ভর করে তার স্বরূপ বোঝার জন্য দেশের দুটি জনপ্রিয় জাতীয় দৈনিক পত্রিকা “দৈনিক প্রথম আলো” এবং “New Age” পত্রিকা নির্বাচন করা হয়েছে। দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকা ২০১৬ সালের ২৭ নভেম্বর থেকে ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৭ দিনের এবং New Age পত্রিকার ২০০৯ সালের ডিসেম্বরের ০৪-১০ তারিখের ৭ দিনের সহ মোট ১৪ দিনের পত্রিকার আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠাটির আধেয় বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
এই ১৪ দিনের পত্রিকায় পররাষ্ট্র বিষয়ক সংবাদ ছিল মোট ১৪৬টি। পত্রিকা দুটির অধিকাংশ আন্তর্জাতিক সংবাদই আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপি ও রয়টার্স থেকে নেওয়া। এছাড়া প্রথম আলোর অনেক সংবাদ বিবিসি থেকেও নেওয়া হয়েছে। তাছাড়া এসব সূত্র থেকে আসা সংবাদগুলোর অধিকাংশই পৃষ্ঠার উপরের দিকে ৩-৪ কলামব্যাপী ছাপা হয়েছে। অর্থাৎ সবচেয়ে বেশি হাইলাইট করা হয়েছে। এবং অন্যান্য যেমন- এপি, এনডিটিভি, ডন, গার্ডিয়ান পত্রিকা থেকে নেওয়া সংবাদগুলো ১-২ কলাম পত্রিকায় করে ছাপা হয়েছে।



নিম্নে ছকের মাধমে “প্রথম আলো” পত্রিকার নির্বাচিত ৭ দিনের সংখ্যায় প্রকাশিত আন্তর্জাতিক সংবাদের সংখ্যা ও বিশ্লেষণ করা হল-



মোট সংবাদ = ৮০টি


সংবাদ প্রতিবেদনের উৎস বিবেচনায় মোট সংবাদ প্রতিবেদনের সংখ্যা -



এএফপি        =    ৪১
রয়টার্স          =    ১২
বিবিসি          =    ০৬
এনডিটিভি    =    ০৪
অন্যান্য        =    ১৭



সংবাদ উৎস
বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত প্রতিবেদন
মোট প্রতিবেদন
শতকরা হিসাব
এএফপি
৪১
৮০
৫১.২৫ %
রয়টার্স
১২
৮০
১৫ %
বিবিসি
০৬
৮০
৭.৫ %
এনডিটিভি
০৪
৮০
০৫ %
ডন
০২
৮০
২.৫ %
গার্ডিয়ান
০১
৮০
১.২৫ %
চ্যানেল নিউজ এশিয়া
০১
৮০
১.২৫ %
এপি
০১
৮০
১.২৫ %
নিজস্ব প্রতিবেদক
১২
৮০
১৫ %





উপরোক্ত ছকের সাহায্যে বোঝা যাচ্ছে, “দৈনিক প্রথম আলো” পত্রিকায় প্রকাশিত আন্তর্জাতিক সংবাদের শতকরা ৫০% সংবাদই সংবাদসংস্থা এএফপি থেকে আসে। এবং বাকি ৫০% এর মধ্যে ২০ ভাগ আসে রয়টার্স থেকে, ২০ ভাগ আসে নিজস্ব প্রতিবেদক থেকে এবং বাকি ১০ ভাগ আসে অন্যান্য সংবাদমাধ্যম থেকে।   




ইংরেজি দৈনিক “New Age” পত্রিকার নির্বাচিত ৭ দিনের সংখ্যায় প্রকাশিত আন্তর্জাতিক সংবাদের সংখ্যা ও বিশ্লেষণ করা হল-

মোট সংবাদ = ৬৬টি

সংবাদ প্রতিবেদনের উৎস বিবেচনায় মোট সংবাদ প্রতিবেদনের সংখ্যা


এএফপি = ৪১ 
রয়টার্স = ১৫
এপি =  ০৮ 
অন্যান্য = ২


সংবাদ উৎস
বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত প্রতিবেদন
মোট প্রতিবেদন
শতকরা হিসাব
এএফপি
৪১
৬৬
৬২.১২ %
রয়টার্স
১৫
৬৬
২২.৭২ %
এপি
০৮
৬৬
১২.১২ %
পিটিআই
০২
৬৬
৩.০৩  %
নিজস্ব প্রতিবেদক
০০
৬৬
০ %










উপরোক্ত ছকের সাহায্যে বোঝা যাচ্ছে “New Age” পত্রিকায় প্রকাশিত আন্তর্জাতিক সংবাদের শতকরা ৮০% সংবাদই সংবাদসংস্থা এএফপি থেকে আসে। এবং বাকি ২০% সংবাদের মধ্যে রয়টার্স থেকে সিংহভাগ নেওয়া হয়।  









এই দুটি পত্রিকায় নিজস্ব প্রতিনিধি থেকে আসা সংবাদ ছিল মোট ১২টি, যার সবকয়টি এসেছে দৈনিক “প্রথম আলো” পত্রিকা থেকে। অর্থাৎ “New Age” পত্রিকায় নিজস্ব প্রতিনিধি থেকে আসা আন্তর্জাতিক সংবাদের সংখ্যা শুন্যের কোঠায়।







আর এই নিজস্ব প্রতিনিধি বলতে কোলকাতা, নয়াদিল্লী, প্যারিস, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য কিংবা নিউইয়র্কে থাকা বিশেষ প্রতিনিধিকে বোঝানো হয়েছে। ফলে নিজস্বতার স্বরূপ খুঁজে পাওয়া এখানে কষ্টসাধ্য।



সাম্রাজ্যবাদের জায়গা থেকে ভাবলে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক সংবাদের জন্য প্রথম আলোর মতো একটি জনপ্রিয় সংবাদপত্র অতিমাত্রায় নির্ভরশীল যা বাংলাদেশের সংবাদ প্রবাহের ক্ষেত্রে বিশেষ উদ্বেগজনক।

পশ্চিমা সংবাদ সংস্থার আধিপত্যের ফলে  আমরা কেবল জগতের খণ্ডিত, ঘোলাটে, একপেশে সংবাদই পাচ্ছি না বরং বিপুল সংবাদ পেলেও পাচ্ছি অতি নির্বাচিত সংবাদ। গুটিকয়েক সংবাদসংস্থার উপর নির্ভরতার কারণে আমাদের জগত হয়ে এসেছে ছোট ও সংকীর্ণ। 

পৃথিবীব্যাপী সংবাদ পরিবেশনে এপি, এএফপি, রয়টার্স -- এই তিনটি সংবাদসংস্থাই মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। সংবাদসংস্থা তিনটি পশ্চিমা -- যথাক্রমে আমেরিকান, ফরাসি ও ব্রিটিশ। ফলে আন্তর্জাতিক সংবাদগুলোতে একপাকি পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গি পরিবেশিত হয়। আমাদের সংবাদপত্রগুলো সেগুলো অনুবাদ করে দিয়েই দায়িত্ব শেষ হয়েছে বলে মনে করে। তাই আন্তর্জাতিক ইস্যুগুলোতে অর্থনৈতিকভাবে উন্নত, পশ্চিমা ও সাম্রাজ্যবাদী দেশের সরকার ও গণমাধ্যমের যে-মতামত পাওয়া যায়, আমাদের গণমাধ্যমেও সেই একই সুর শোনা যায়। টুইন টাওয়ারে হামলার পরে, আফগানিস্তানে যুদ্ধ শুরু হবার পরে ফক্স নিউজ চ্যানেল সংবাদের লেবেল ব্যবহার করেছে 'আমেরিকা আন্ডার এটাক', 'আমেরিকা এট ওয়্যার'আর আমাদের দেশের সংবাদপত্রেও দেখা গেছে সংবাদে ও অভিমত-কলামে 'আক্রান্ত আমেরিকা' লেবেল ব্যবহার করতে। পরে দেখা গেছে আফগানিস্তানে আমেরিকার যুদ্ধ কতটা নির্মম ও নিষ্ঠুর হয়েছে। পত্রিকাগুলো পরের দিকে নিজেরাও বুঝতে পেরেছে আফগানিস্তানে যুদ্ধের এবং এমনকি টুইন টাওয়ারে হামলার কারণও হয়তো অন্য কিছু। আন্তর্জাতিক সংবাদ-সংস্থার ওপরে অত্যাধিক নির্ভরশীলতার কারণে আমাদের সংবাদপত্রগুলোকে এমন দেখায় যেন তারা পশ্চিমা ও সাম্রাজ্যবাদী মতাদর্শের হয়ে কাজ করছে।

তৃতীয় বিশ্বের ও অপশ্চিমা একটি দেশ হিসেবে তৃতীয় বিশ্বের অন্য একটি দেশের সঙ্গেও আমাদের সাধারণ কিছু স্বার্থগত অবস্থানগত মিল রয়েছে। তাই তৃতীয় বিশ্বের কোনো মুসলিম বা অমুসলিম দেশের ওপরে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন হলে আমাদের মিডিয়ার ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত, তা স্পষ্ট বলে দেবার অপো রাখে না। কিন্তু আমাদের মিডিয়ার সংবাদ পরিবেশনের ধরন দেখে মনে হয়, তারা সাম্রাজ্যবাদের পক্ষেই সংবাদ পরিবেশন করছে। বিদেশী সংবাদসংস্থার ওপরে অতি নির্ভরশীলতার কারণেই এটা হয়ে থাকে।