এই ব্লগটি সন্ধান করুন

বুধবার, ৩ মে, ২০১৭

আমার ক্যাম্পাস

সময়টি ছিল ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ অর্থাৎ পহেলা ফাল্গুন। এমন একটি বিশেষ দিনেই জানতে পারি আমার জীবনের সবচেয় প্রিয় একটি সংবাদ। সেদিন সকালেই এক বন্ধু ফোন দিয়ে জানায় আমার দেখা সব থেকে সুন্দর ক্যাম্পাসেই কিনা আমি পড়ার সুযোগ পেয়েছি। খবরটি পেয়ে আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না। সোজা চলে যাই মার কাছে। তাকে জানানোর পর তিনিও আল্লাহ্‌র কাছে শুকরিয়া আদায় করেন। সেদিন কি করবো কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। আর ঠিক তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম এবারের ফাল্গুনটা আমার ক্যাম্পাস অর্থাৎ আমার জানবিবিতেই উদযাপন করবো। তাই আর দেরি না করে পাঞ্জাবী পরে সোজা চলে যাই আমার ক্যাম্পাস জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে।


ছবি- ডেইরী গেইট, জাবি। 

যখন ক্যাম্পাসে পৌছালাম তখন ঘড়ির কাটায় সকাল ১০.৩০। ছোটবেলা থেকেই বসন্ত আমার প্রিয় ঋতু। আর ঠিক এরকম একটা ঋতুতে ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য যেন আরও দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায়। আর সেই সৌন্দর্য আমার চোখেও দিল ক্যাম্পাসে পৌঁছানোর সাথে সাথে। ডেইরী গেইট থেকে রিক্সা নিয়ে সোজা চলে যাই নতুন কলার সামনে মহুয়া তলায়। সেখানেই প্রথম পরিচিত হই আমার ক্লাসমেটদের সাথে। যেখানে ক্লাসে কিনা আমাদের পরিচয় হওয়ার কথা ছিল সেখানে কিনা ক্লাসের বাহিরেই ভাগ্য আমাদের একে অপরের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। সেদিন থেকেই শুরু হল জীবনের সবচেয়ে আনন্দময় সময়। এই ক্লাসমেটরাই ধীরে ধীরে খুব আপন মানুষ হয়ে গেলো। আর তাদের মধ্যেই কেউ কেউ হয়ে গেলো খুব কাছের মানুষ যাদের সাথে ঘুরাফিরা, আড্ডা থেকে শুরু করে নিজের মনের সব কথা নির্দ্বিধায় শেয়ার করতে পারি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় দেশের একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়। এখনে হলের সিট অনুযায়ী শিক্ষার্থী ভর্তি করা হায়। আর তাই ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের সব জেলা থেকেই শিক্ষার্থীরা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন দেখে। বর্তমানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ১৫ টি হল আছে, যার মধ্যে ছেলেদের হল ৭টি এবং মেয়েদের হল ৮টি। এছাড়া ছেলেদের জন্য আরও একটি হল  (বিশ্বকবি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর হল) নির্মাণাধীন অবস্থায় আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর জানতে পারি শহীদ সালাম বরকত হলই হল আমার দ্বিতীয় ঠিকানা। হলের পরিবেশ প্রথমে আমার জন্য কিছুটা বিব্রতকর ছিল। কারণ তখন নবীন শিক্ষার্থীরা হলে সিট না পেয়ে গনরুমে একসাথে থাকা শুরু করে। এরকম একসাথে একটি বিশাল রুমে থাকার অভ্যাস আমার কখনই ছিল না। তাই শুরুর কয়েকটা দিন নিজেকে সামলানো একটু কষ্টই ছিল আমার জন্য। কোথায় ভেবেছিলাম দেশের একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন পড়ার সুযোগ পেয়েছি তাই হয়তো এখানে আমি থাকার জন্য একা একটি রুম পাবো আর সেখানে কিনা একটি রুমেই সবাই মিলে থাকতে হচ্ছে। কিন্তু পরবর্তীতে অনুধাবন করলাম হলের গনরুমে থাকার দিন গুলোই ছিল ক্যাম্পাসের শ্রেষ্ঠ সময়। সেই গনরুমে দেশের বিভিন্ন জেলার শিক্ষার্থীদের সাথে পরিচয় হওয়া, তাদের সাথে বন্ধুত্ত গড়া, তাদের আঞ্চলিক ভাষা শুনে কখনো কখনো ঠাট্টা করা, রাত জেগে সবাই মিলে আড্ডা দেওয়া, গভীর রাতে ক্যাম্পাসে ঘুরতে যাওয়া আবার একে অপরের সাথে ছোট ছোট বিষয় নিয়ে কখনো কখনো ঝগড়া করা সবই ছিল গনরুমের বন্ধুদের সাথে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল এই গণরুমই আমাদের ঐক্যবদ্ধ ভাবে চলা শেখায়।


শহীদ সালাম বরকত হলের গণরুমের একাংশ।

এই বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশোনা ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি আরও একটি বিষয়ের এর জন্য বেশ বিখ্যাত। সেটি হল ক্যাম্পাসের বটতলার খাবার। এই বটতলায় বর্তমানে প্রায় ৭০টি দোকান আছে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত জমজমাট আড্ডায় প্রাণবন্ত থাকে বটতলার প্রতিটি প্রান্ত। প্রতিটি দোকানে রয়েছে বাহারি খাবারের সমাহার। দামে সস্তা কিন্তু মানে ভাল। মেনু হিসেবে এখানে পাওয়া যায় ১০-১২ রকমের ভর্তা যেমন- টাকি মাছের ভর্তা, পেঁপে ভর্তা, আলু ভর্তা, শুঁটকি ভর্তা, ডিম ভর্তা, শিম ভর্তা, কালোজিরা ভর্তা, বাদাম ভর্তা ধনেপাতার ভর্তা, মিষ্টিকুমড়া ভর্তাসহ আরও কত কি! এছাড়াও এখানে ডাল ভুনা, নানা ধরণের সবজি, গরুর মাংস, মুরগীর মাংস, হাসের মাংস, ডিম থেকে শুরু করে রুই পুঁটি, কাচকি ইলিশসহ নানা ধরণের ছোট বড় মাছ পাওয়া যায়। এছাড়া বটতলার দোকানগুলোর নামও বাহারি। এসব নাম দেশের বড় বড় হোটেল ও রেস্টুরেন্টের নামকেও হার মানাবে। যেমন- 'খালার দোকান', 'কেএফসি (কাদের ফুড সেন্টার)', 'রাবেয়া ভাত ঘর', 'রাফি হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট' ইত্যাদি। খাবার পরিবেশনেও রয়েছে ভিন্ন আমেজ। যা খাবারের রুচিতে নতুন মাত্রা যোগ করে।


জাবির বটতলায় অবস্থিত একটি খাবারের দোকানের ছবি।

জাবিকে বলা হয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি। এছাড়া এই ক্যাম্পাস অতিথি পাখির অভয়ারণ্য। পূর্বে জানতাম এই ক্যাম্পাসে শীতকালে অতিথি পাখি দেখতে অনেক দর্শনার্থী আসে। কিন্তু এই ক্যাম্পাসে ভর্তি হওয়ার পর বুঝলাম এই দর্শনার্থীদের শুধুমাত্র 'অনেক' শব্দ দ্বারা সম্বোধন করা যায় না। কারণ প্রতি বছর শীতে বিশেষ করে বন্ধের দিনগুলোতে দর্শনার্থীদের জন্য আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীরা হাঁটার জায়গাটি পর্যন্ত পাই না। এতোটাই সুন্দর আমার এই ক্যাম্পাস, যেখানে শুধু মানুষ পড়তে না বরং দেখতেও আসে।  


শীতে অতিথি পাখির আগমনে মুখরিত জাবি ক্যাম্পাস।

আমার ক্যাম্পাস শুধুমাত্র তার সৌন্দর্যে নয় বরং আরও অনেক দিক থেকেই এগিয়ে আছে অন্য অনেক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এই ক্যাম্পাসে দক্ষিন এশিয়ার সর্ববৃহৎ বিজ্ঞান গবেষণাগার কেন্দ্র আছে। শুধু তাই নয় দেশের সবচেয়ে বেশি গবেষকও (পি এইচ ডি, এমফিল, রিপোর্ট, থিসিস ) এই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েরই। এমনকি বিগত ৩ বছরে বর্ষসেরা গবেষকের স্বীকৃতি পাওয়া শিক্ষক এই ক্যাম্পাসেরই। দেশের সবচেয়ে উঁচু শহীদ মিনার এই জাবিতেই অবস্থিত। এছাড়া পৃথিবীর অন্যতম বড় প্রজাপতি মেলা হয় এখানে। প্রতি বছর শীতে পাখি মেলা ক্যাম্পাসের জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয় অনেকখানি।

আমার ক্যাম্পাস আমার দ্বিতীয় ঘর। এখানে ভর্তি হওয়ার পর নতুন আরেক জীবনের সন্ধান পেয়েছি আমি। শুরুটা ২০১৩ তে হলেও এখন পর্যন্ত এই ক্যাম্পাসই আমার সব থেকে ভালোবাসার জায়গা। যেখানে আমার মন খারাপ করে থাকার কোন সুযোগই নেই। ক্লাস, পড়াশোনার পাশাপাশি মুরাদ চত্বরে আড্ডা, টারজান পয়েন্টে বিকেলে ফুচকা খাওয়া আর সন্ধ্যার পর ট্রান্সপোর্ট অঙ্গনে চায়ের সাথে বন্ধুদের মাঝে আড্ডা। এই তো যেন জীবন। এখানে মানুষ প্রান্তিক থেকে চৌরঙ্গী, পুরাতন থেকে নতুন কলা ভবন, সমাজবিজ্ঞান থেকে বিজ্ঞান বিষয়ক অনুষদে জীবনের দেখা পায়। আর তাই নিঃসন্দেহে গর্ব করে বলতে পারি আমি জাবির ছাত্র।
















  

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন