এই ব্লগটি সন্ধান করুন

বুধবার, ৩ মে, ২০১৭

আমার ক্যাম্পাস

সময়টি ছিল ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ অর্থাৎ পহেলা ফাল্গুন। এমন একটি বিশেষ দিনেই জানতে পারি আমার জীবনের সবচেয় প্রিয় একটি সংবাদ। সেদিন সকালেই এক বন্ধু ফোন দিয়ে জানায় আমার দেখা সব থেকে সুন্দর ক্যাম্পাসেই কিনা আমি পড়ার সুযোগ পেয়েছি। খবরটি পেয়ে আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না। সোজা চলে যাই মার কাছে। তাকে জানানোর পর তিনিও আল্লাহ্‌র কাছে শুকরিয়া আদায় করেন। সেদিন কি করবো কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। আর ঠিক তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম এবারের ফাল্গুনটা আমার ক্যাম্পাস অর্থাৎ আমার জানবিবিতেই উদযাপন করবো। তাই আর দেরি না করে পাঞ্জাবী পরে সোজা চলে যাই আমার ক্যাম্পাস জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে।


ছবি- ডেইরী গেইট, জাবি। 

যখন ক্যাম্পাসে পৌছালাম তখন ঘড়ির কাটায় সকাল ১০.৩০। ছোটবেলা থেকেই বসন্ত আমার প্রিয় ঋতু। আর ঠিক এরকম একটা ঋতুতে ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য যেন আরও দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায়। আর সেই সৌন্দর্য আমার চোখেও দিল ক্যাম্পাসে পৌঁছানোর সাথে সাথে। ডেইরী গেইট থেকে রিক্সা নিয়ে সোজা চলে যাই নতুন কলার সামনে মহুয়া তলায়। সেখানেই প্রথম পরিচিত হই আমার ক্লাসমেটদের সাথে। যেখানে ক্লাসে কিনা আমাদের পরিচয় হওয়ার কথা ছিল সেখানে কিনা ক্লাসের বাহিরেই ভাগ্য আমাদের একে অপরের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। সেদিন থেকেই শুরু হল জীবনের সবচেয়ে আনন্দময় সময়। এই ক্লাসমেটরাই ধীরে ধীরে খুব আপন মানুষ হয়ে গেলো। আর তাদের মধ্যেই কেউ কেউ হয়ে গেলো খুব কাছের মানুষ যাদের সাথে ঘুরাফিরা, আড্ডা থেকে শুরু করে নিজের মনের সব কথা নির্দ্বিধায় শেয়ার করতে পারি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় দেশের একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়। এখনে হলের সিট অনুযায়ী শিক্ষার্থী ভর্তি করা হায়। আর তাই ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের সব জেলা থেকেই শিক্ষার্থীরা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন দেখে। বর্তমানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ১৫ টি হল আছে, যার মধ্যে ছেলেদের হল ৭টি এবং মেয়েদের হল ৮টি। এছাড়া ছেলেদের জন্য আরও একটি হল  (বিশ্বকবি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর হল) নির্মাণাধীন অবস্থায় আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর জানতে পারি শহীদ সালাম বরকত হলই হল আমার দ্বিতীয় ঠিকানা। হলের পরিবেশ প্রথমে আমার জন্য কিছুটা বিব্রতকর ছিল। কারণ তখন নবীন শিক্ষার্থীরা হলে সিট না পেয়ে গনরুমে একসাথে থাকা শুরু করে। এরকম একসাথে একটি বিশাল রুমে থাকার অভ্যাস আমার কখনই ছিল না। তাই শুরুর কয়েকটা দিন নিজেকে সামলানো একটু কষ্টই ছিল আমার জন্য। কোথায় ভেবেছিলাম দেশের একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন পড়ার সুযোগ পেয়েছি তাই হয়তো এখানে আমি থাকার জন্য একা একটি রুম পাবো আর সেখানে কিনা একটি রুমেই সবাই মিলে থাকতে হচ্ছে। কিন্তু পরবর্তীতে অনুধাবন করলাম হলের গনরুমে থাকার দিন গুলোই ছিল ক্যাম্পাসের শ্রেষ্ঠ সময়। সেই গনরুমে দেশের বিভিন্ন জেলার শিক্ষার্থীদের সাথে পরিচয় হওয়া, তাদের সাথে বন্ধুত্ত গড়া, তাদের আঞ্চলিক ভাষা শুনে কখনো কখনো ঠাট্টা করা, রাত জেগে সবাই মিলে আড্ডা দেওয়া, গভীর রাতে ক্যাম্পাসে ঘুরতে যাওয়া আবার একে অপরের সাথে ছোট ছোট বিষয় নিয়ে কখনো কখনো ঝগড়া করা সবই ছিল গনরুমের বন্ধুদের সাথে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল এই গণরুমই আমাদের ঐক্যবদ্ধ ভাবে চলা শেখায়।


শহীদ সালাম বরকত হলের গণরুমের একাংশ।

এই বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশোনা ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি আরও একটি বিষয়ের এর জন্য বেশ বিখ্যাত। সেটি হল ক্যাম্পাসের বটতলার খাবার। এই বটতলায় বর্তমানে প্রায় ৭০টি দোকান আছে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত জমজমাট আড্ডায় প্রাণবন্ত থাকে বটতলার প্রতিটি প্রান্ত। প্রতিটি দোকানে রয়েছে বাহারি খাবারের সমাহার। দামে সস্তা কিন্তু মানে ভাল। মেনু হিসেবে এখানে পাওয়া যায় ১০-১২ রকমের ভর্তা যেমন- টাকি মাছের ভর্তা, পেঁপে ভর্তা, আলু ভর্তা, শুঁটকি ভর্তা, ডিম ভর্তা, শিম ভর্তা, কালোজিরা ভর্তা, বাদাম ভর্তা ধনেপাতার ভর্তা, মিষ্টিকুমড়া ভর্তাসহ আরও কত কি! এছাড়াও এখানে ডাল ভুনা, নানা ধরণের সবজি, গরুর মাংস, মুরগীর মাংস, হাসের মাংস, ডিম থেকে শুরু করে রুই পুঁটি, কাচকি ইলিশসহ নানা ধরণের ছোট বড় মাছ পাওয়া যায়। এছাড়া বটতলার দোকানগুলোর নামও বাহারি। এসব নাম দেশের বড় বড় হোটেল ও রেস্টুরেন্টের নামকেও হার মানাবে। যেমন- 'খালার দোকান', 'কেএফসি (কাদের ফুড সেন্টার)', 'রাবেয়া ভাত ঘর', 'রাফি হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট' ইত্যাদি। খাবার পরিবেশনেও রয়েছে ভিন্ন আমেজ। যা খাবারের রুচিতে নতুন মাত্রা যোগ করে।


জাবির বটতলায় অবস্থিত একটি খাবারের দোকানের ছবি।

জাবিকে বলা হয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি। এছাড়া এই ক্যাম্পাস অতিথি পাখির অভয়ারণ্য। পূর্বে জানতাম এই ক্যাম্পাসে শীতকালে অতিথি পাখি দেখতে অনেক দর্শনার্থী আসে। কিন্তু এই ক্যাম্পাসে ভর্তি হওয়ার পর বুঝলাম এই দর্শনার্থীদের শুধুমাত্র 'অনেক' শব্দ দ্বারা সম্বোধন করা যায় না। কারণ প্রতি বছর শীতে বিশেষ করে বন্ধের দিনগুলোতে দর্শনার্থীদের জন্য আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীরা হাঁটার জায়গাটি পর্যন্ত পাই না। এতোটাই সুন্দর আমার এই ক্যাম্পাস, যেখানে শুধু মানুষ পড়তে না বরং দেখতেও আসে।  


শীতে অতিথি পাখির আগমনে মুখরিত জাবি ক্যাম্পাস।

আমার ক্যাম্পাস শুধুমাত্র তার সৌন্দর্যে নয় বরং আরও অনেক দিক থেকেই এগিয়ে আছে অন্য অনেক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এই ক্যাম্পাসে দক্ষিন এশিয়ার সর্ববৃহৎ বিজ্ঞান গবেষণাগার কেন্দ্র আছে। শুধু তাই নয় দেশের সবচেয়ে বেশি গবেষকও (পি এইচ ডি, এমফিল, রিপোর্ট, থিসিস ) এই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েরই। এমনকি বিগত ৩ বছরে বর্ষসেরা গবেষকের স্বীকৃতি পাওয়া শিক্ষক এই ক্যাম্পাসেরই। দেশের সবচেয়ে উঁচু শহীদ মিনার এই জাবিতেই অবস্থিত। এছাড়া পৃথিবীর অন্যতম বড় প্রজাপতি মেলা হয় এখানে। প্রতি বছর শীতে পাখি মেলা ক্যাম্পাসের জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয় অনেকখানি।

আমার ক্যাম্পাস আমার দ্বিতীয় ঘর। এখানে ভর্তি হওয়ার পর নতুন আরেক জীবনের সন্ধান পেয়েছি আমি। শুরুটা ২০১৩ তে হলেও এখন পর্যন্ত এই ক্যাম্পাসই আমার সব থেকে ভালোবাসার জায়গা। যেখানে আমার মন খারাপ করে থাকার কোন সুযোগই নেই। ক্লাস, পড়াশোনার পাশাপাশি মুরাদ চত্বরে আড্ডা, টারজান পয়েন্টে বিকেলে ফুচকা খাওয়া আর সন্ধ্যার পর ট্রান্সপোর্ট অঙ্গনে চায়ের সাথে বন্ধুদের মাঝে আড্ডা। এই তো যেন জীবন। এখানে মানুষ প্রান্তিক থেকে চৌরঙ্গী, পুরাতন থেকে নতুন কলা ভবন, সমাজবিজ্ঞান থেকে বিজ্ঞান বিষয়ক অনুষদে জীবনের দেখা পায়। আর তাই নিঃসন্দেহে গর্ব করে বলতে পারি আমি জাবির ছাত্র।
















  

মঙ্গলবার, ২ মে, ২০১৭

ফেসবুক ও তরুণ সমাজ

ফেসবুক বর্তমান সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় একটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। মার্ক জাকারবার্গ নামের একজন তরুণ ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশেও এর জনপ্রিয়তা আকাশ চুম্বি। বিটিআরসির (BTRC) হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে ২০১৫ সালের আগস্টে ইন্টারনেট ব্যাবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি ৮ লাখ। আর ফেসবুক ব্যাবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি। প্রতি ১২ সেকেন্ডে একটি করে ফেসবুক একাউন্ট খোলা হচ্ছে যেটা বাংলাদেশের জন্মহারের চেয়েও বেশি। আর এর ব্যাবহারকারীর মধ্যে তরুণরাই সবচেয়ে বেশি।

ফেসবুক ব্যাবহারকারীর বেশীরভাগই সাধারণত পারস্পরিক যোগাযোগের জন্য ব্যাবহার করে থাকে। এছাড়া নিজের মত প্রকাশ, চিন্তা, মনের অবস্থা এসব কিছু ফেসবুকের মাধ্যমে তারা একে অপরের সাথে স্ট্যাটাসের মাধ্যমে শেয়ার করে থাকে। তরুণদের কাছে তাদের নিজেদের চিন্তা-ভাবনা তুলে ধরার জন্য ফেসবুক একটি সহজ মাধ্যম। প্রতিদিন তারা কোন ইস্যুকে প্রাধান্য দিচ্ছে তাও বোঝা যায় এই মাধ্যম থেকে। তাদের কোন মন্তব্য বা প্রচারণা ভাইরাল হয়, আবার কোন ভিডিও ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।

ফেসবুকের কারণে আজ যোগাযোগ অনেক সহজ হয়ে গেছে। তবে এর ব্যাবহারে যেমন ইতিবাচক দিক পাওয়া যাচ্ছে তেমন কিছু নেতিবাচক দিকও প্রায়শেই আমাদের সামনে আসে। যেহেতু তরুণ প্রজন্মের কাছে ফেসবুক বেশি জনপ্রিয় তাই এর প্রভাবও তাদের উপরেই বেশি দেখা যায়। ফেসবুক ব্যাবহারে নেতিবাচক দিক থেকে সবচেয়ে বেশি যেটি দেখা যায় তা হল অন্যের তথ্য দিয়ে ফেক আইডি খোলা এবং তা দিয়ে বিভিন্ন অপপ্রচার চালানো। অনেক সময় এই বিষয়টি এতোটাই ঘোলা হয় যে, যার তথ্য চুরি করে ফেক আইডি খোলা হয়েছে তাকে নানা ভাবে ব্ল্যাকমেইলও করা হয়।

ইন্টারনেট ব্যাবহারকারী সহজে নিজের পরিচয় গোপন রাখতে পারে বলে কাউকে হুমকি দেওয়া, ভুয়া সম্পর্কের ফাঁদে ফেলে টাকা হাতিয়ে নেওয়া অথবা প্রতিশোধ গ্রহনের জন্য ব্যাক্তিগত অন্তরঙ্গ মুহূর্তের দৃশ্য ধারণ করে ফেসবুকে ছড়িয়ে থাকে।

তরুণদের মধ্যে প্রায়ই দেখা যায় তারা ফেসবুকে অপরিচিত ব্যক্তির সাথে বন্ধুত্ব তৈরি করে। অনেক সময় এই বন্ধুত্ব এতোটাই গভীর হয়ে যে তা প্রেম থেকে শুরু করে বিয়ে পর্যন্ত গড়ায়। আর এতে অনেকেই প্রতারণার স্বীকারও হচ্ছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে আমরা প্রায়ই দেখি ফেসবুকে পরিচয় হওয়া ব্যক্তির সাথে বিয়ে করে প্রতারণার স্বীকার হওয়া।

সম্প্রতি ঢাকার উত্তরা এলাকায় এক কিশোর হত্যার ঘটনায় তরুণদের ফেসবুক ব্যাবহারে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে। তারা ফেসবুক পেজ খুলে গোড়ে তোলে নানা সন্ত্রাসী গ্রুপ। আবার ধানমন্ডিতে দুই তরুণের মারধর করার ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হলে তা সে সময় ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করে।

ফেসবুক প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ নিত্য নতুন ফিচার যুক্ত করছেন ফেসবুকে। ইদানিং যুক্ত হয়েছে লাইভ ভিডিও বা ফেসবুক লাইভ। আর এই সুবাদে যুক্ত হয়েছে প্রতারণার নতুন মাত্রাও। ফেসবুকে সরাসরি সপ্রচারের নামে দেখানো হচ্ছে পুরানো ভিডিও। আবার কখনো কখনো দেখা যায় এই ফেসবুক লাইভ ভিডিও তে যৌন সুড়সুড়ি বর্ধক অশ্লীল দৃশ্য, যা আমাদের যুব সমাজে ভয়াবহ যৌন উত্তেজনা সৃষ্টি করছে। আর এতে প্রতিনিয়ত ধ্বংস করে দিচ্ছে আমাদের তরুণ-তরুণীদের জীবন, ধসিয়ে দিচ্ছে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ভিত্তিমূল।

তবে এসবের বাইরে তরুণরা এখন পড়াশোনা, সমাজ সেবা, রক্তদান কর্মসূচি, সামাজিক ক্যাম্পেইন, সৃজনশীল কাজ এমনকি ব্যবসার জন্যও ফেসবুক ব্যাবহার করছে।

বর্তমান সময় ফেসবুক হল তরুণদের কাছে প্রতিবাদের এক অনন্য মাধ্যম। তরুণরা এখন আর সমাজে ঘটে যাওয়া নানা অপরাধ চোখমুখ বন্ধ করে সহ্য করে না। তারা ফেসবুকে বিভিন্ন পোস্টের মাধ্যম হোক কিংবা মন্তব্য করে হোক এমনকি সিটিজেন জার্নালিস্টের ভুমিকা পালন করেও অপরাধের দৃশ্য কিংবা অপরাধীর ছবি ফেসবুকে প্রকাশ করে প্রতিবাদ করে।

নারায়ণগঞ্জের শিক্ষক শ্যামলকান্তির অবমাননার দৃশ্য ফেসবুকে ভাইরাল হলে তা তরুণরাই প্রথম প্রতিবাদ করেছিল ফেসবুকে। আর এ থেকে বিষয়টি পরবর্তীতে মেইনস্ট্রিম মিডিয়াতেও স্থান পায়। এছাড়া তনু হত্যার বিচারের প্রতিবাদ, সিলেটি শিশু রাজন হত্যার বিচারের প্রতিবাদ এমনকি ঐতিহাসিক শাহাবাগের গণজাগরণ মঞ্চেও তরুণরা ফেসবুক ব্যাবহার করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তরুণদের নতুন এক প্রবণতা গড়ে উঠেছে আর তা হল ফেসবুক ব্লগিং। রাজনীতি, অর্থনীতি, সাহিত্য, খেলাধুলা, চলচ্চিত্র এবং বিভিন্ন সামাজিক বিষয় নিয়ে আগে তরুণরা যা ব্লগে লিখতো, তা এখন ফেসবুক স্ট্যাটাসেই লেখে। সেখানে অপরপক্ষ বিভিন্ন মন্তব্য করে এবং চলে নানা বিতর্ক।

আমাদের তরুণদের মাঝে লুকিয়ে আছে নানা প্রতিভা। অনেক সময় এই প্রতিভা তারা প্রকাশ করার মতো যথেষ্ট সুযোগ সুবিধা পায় না। তখন তারা নিজেরাই তাদের প্রতিভা সবার সামনে তুলে ধরতে চায়। আর এটি করতে তারা ব্যাবহার করে ফেসবুক। দেখা যায় অনেকে ভাল গান গাইতে পারে। কিন্তু তেমন সুযোগ না পাওয়ায় সে কখনই তার এই প্রতিভা সবার সামনে তুলে ধরতে পারে না। তখন সে ফেসবুকে তার নিজের গান শেয়ার করে কিংবা ফেসবুক লাইভে গান গেয়ে তার প্রতিভা সবার সামনে তুলে ধরছে। এভাবে ধীরে ধীরে সে হয়ে যায় একজন সেলিব্রেটি।

হিরো আলমকে আজ আমরা সবাই চিনি। কিন্তু মাত্র কিছু দিন আগেও এই তরুণ কে আমরা কেউই চিনতাম না। ফেসবুকে যখন তার অভিনীত নাটক বা গান ভাইরাল হল তখন ধীরে ধীরে আমরা সবাই তাকে চিনতে শুরু করলাম। আর এখন হিরো আলম হয়ে গেলো একজন সেলিব্রেটি।  

তাই দেখা যাচ্ছে ফেসবুক ব্যাবহারে তরুণদের জন্য তা শুধুমাত্র নেতিবাচক প্রভাবই বয়ে আনে না, বরং এর ব্যাবহারে অনেক ইতিবাচক দিকও পাওয়া যায়। অনেকে মনে করেন ফেসবুক বা ইন্টারনেট আমাদের তরুণ সমাজকে অবক্ষয়য়ের দিকে ধাবিত করে। তারা মনে করে তরুণরা ফেসবুক ব্যাবহার করে কত না খারাপ কিছু করে ফেলছে। কিন্তু এমন অনেক তরুণই আছে যারা ফেসবুকের ইতিবাচক দিকটাকেই নিজেদের জন্য নির্বাচন করে। তাই অবিভাবকদের উচিৎ তার সন্তান কোন দিকে যাচ্ছে সেই দিকটি যেন তারা লক্ষ্য রাখে।

কিছুদিন আগে শিক্ষার্থী ও তরুণ সমাজের মঙ্গলের জন্য রাতে ৬ ঘণ্টা  ফেসবুক বন্ধ রাখার চিন্তা করে বাংলাদেশ সরকার। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ক্ষতি ও তরুণদের কর্মদক্ষতায় বিরূপ প্রভাবের কথা চিন্তা করে এই সিদ্ধান্ত নিতে চেয়েছে আমাদের সরকার। কিন্তু রাতে ৬ ঘণ্টা ফেসবুক বন্ধ রাখলেই কি সব সমস্যার সমাধান হয়? বর্তমানে আমাদের দেশে ফেসবুক বেবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি। যার মধ্যে ৭০-৮০ শতাংশই হল তরুণসমাজ। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছে ফেসবুক এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকে নিজেদের প্রতিষ্ঠানের প্রচারণার জন্য কিংবা ব্যবসার জন্য এমনকি পড়াশোনা থেকে শুরু করে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজে ফেসবুককে ব্যাবহার করে। সবার জন্য তো আর সময় নির্ধারিত নয়। দেখা যায় কেউ তাদের এসব কাজ দিনেই করে থাকে আবার কেউ করছে রাতে। তাই তরুণ কিংবা শিক্ষার্থী যাদের জন্যই হোক রাতে ৬ ঘণ্টা ফেসবুক বন্ধ রাখা কোন ভাবেই সঠিক সিদ্ধান্ত নয় বলে আমি মনে করি।



































সোমবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

পররাষ্ট্র বিষয়ক সংবাদের জন্য পশ্চিমা সংবাদ সংস্থা ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের উপর বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের অতি নির্ভরতা

বর্তমান আধুনিক যুগে গণমাধ্যম একটি বড় শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে। দেশের অধিকাংশ মানুষ এখন তথ্য পাওয়ার জন্য গণমাধ্যমের উপর  নির্ভরশীল। আর এই নির্ভরশীলতার জন্য গণমাধ্যমও আমাদের সবকিছু শেখানোর গুরু দায়িত্ব নিয়ে ফেলেছে। কীভাবে হরেক পদের রান্না করতে হয়, পরীক্ষার জন্য কোন পড়াটা পড়তে হবে, সামনের শীতে কোন শালটা পরতে হবে, ব্যস্ততার মধ্যেও কীভাবে রূপচর্চার কাজটি চালিয়ে যেতে হবে, কীভাবে ঘর সাজাতে হবে সবকিছুর জন্যই আমারা গণমাধ্যমের উপর নির্ভরশীল হচ্ছি। শুধু তাই নয় মানুষের ভাবনার বিষয়টিও গণমাধ্যমেই ঠিক করে দিচ্ছে। কিন্তু দেশের এই গণমাধ্যমই আবার তথ্য পাওয়ার জন্য পশ্চিমা সংবাদ সংস্থা ও সংবাদমাধ্যমের উপর নির্ভরশীল হয়।

আমাদের দেশের প্রায় সকল গণমাধ্যমই আন্তর্জাতিক সংবাদের জন্য পশ্চিমা সংবাদ সংস্থা কিংবা অন্যান্য পশ্চিমা গণমাধ্যমের উপর নির্ভরশীল। দেশের সকল গণমাধ্যমের পররাষ্ট্র বিষয়ক সংবাদগুলোর শতকরা ৯৭% আসে পশ্চিমা সংবাদ সংস্থা বা গণমাধ্যম থেকে। মূলত আমাদের দেশের সংবাদমাধ্যমগুলো এসব পশ্চিমা সংবাদ সংস্থার দেওয়া তথ্যগুলোকে অনুবাদ করে কিংবা হুবহু আমাদের কাছে তুলে ধরে। তাই দেখা সাধারণ মানুষও সেই সংবাদগুলোকেই সত্য হিসেবে মেনে নেয় যা পশ্চিমারা আমাদেরকে সত্য হিসেবে দেখাতে চায়।

সমগ্র পৃথিবীতে সংবাদ সরবারাহে এপি, এএফপি, রয়টার্স  এই তিনটি সংবাদসংস্থাই মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। সংবাদসংস্থা তিনটি পশ্চিমা যথাক্রমে আমেরিকান, ফরাসি ও ব্রিটিশ। ফলে সারা পৃথিবীতে প্রায় অধিকাংশ দেশে বিশেষ করে ৩য় বিশ্বে আন্তর্জাতিক সংবাদগুলো পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গিতেই পরিবেশিত হয়।

পররাষ্ট্র বিষয়ক সংবাদের জন্য বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলো কতটা বিদেশী সংবাদ সংস্থা কিংবা সংবাদমাধ্যমের উপর নির্ভর করে তার স্বরূপ বোঝার জন্য দেশের দুটি জনপ্রিয় জাতীয় দৈনিক পত্রিকা “দৈনিক প্রথম আলো” এবং “New Age” পত্রিকা নির্বাচন করা হয়েছে। দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকা ২০১৬ সালের ২৭ নভেম্বর থেকে ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৭ দিনের এবং New Age পত্রিকার ২০০৯ সালের ডিসেম্বরের ০৪-১০ তারিখের ৭ দিনের সহ মোট ১৪ দিনের পত্রিকার আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠাটির আধেয় বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
এই ১৪ দিনের পত্রিকায় পররাষ্ট্র বিষয়ক সংবাদ ছিল মোট ১৪৬টি। পত্রিকা দুটির অধিকাংশ আন্তর্জাতিক সংবাদই আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপি ও রয়টার্স থেকে নেওয়া। এছাড়া প্রথম আলোর অনেক সংবাদ বিবিসি থেকেও নেওয়া হয়েছে। তাছাড়া এসব সূত্র থেকে আসা সংবাদগুলোর অধিকাংশই পৃষ্ঠার উপরের দিকে ৩-৪ কলামব্যাপী ছাপা হয়েছে। অর্থাৎ সবচেয়ে বেশি হাইলাইট করা হয়েছে। এবং অন্যান্য যেমন- এপি, এনডিটিভি, ডন, গার্ডিয়ান পত্রিকা থেকে নেওয়া সংবাদগুলো ১-২ কলাম পত্রিকায় করে ছাপা হয়েছে।



নিম্নে ছকের মাধমে “প্রথম আলো” পত্রিকার নির্বাচিত ৭ দিনের সংখ্যায় প্রকাশিত আন্তর্জাতিক সংবাদের সংখ্যা ও বিশ্লেষণ করা হল-



মোট সংবাদ = ৮০টি


সংবাদ প্রতিবেদনের উৎস বিবেচনায় মোট সংবাদ প্রতিবেদনের সংখ্যা -



এএফপি        =    ৪১
রয়টার্স          =    ১২
বিবিসি          =    ০৬
এনডিটিভি    =    ০৪
অন্যান্য        =    ১৭



সংবাদ উৎস
বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত প্রতিবেদন
মোট প্রতিবেদন
শতকরা হিসাব
এএফপি
৪১
৮০
৫১.২৫ %
রয়টার্স
১২
৮০
১৫ %
বিবিসি
০৬
৮০
৭.৫ %
এনডিটিভি
০৪
৮০
০৫ %
ডন
০২
৮০
২.৫ %
গার্ডিয়ান
০১
৮০
১.২৫ %
চ্যানেল নিউজ এশিয়া
০১
৮০
১.২৫ %
এপি
০১
৮০
১.২৫ %
নিজস্ব প্রতিবেদক
১২
৮০
১৫ %





উপরোক্ত ছকের সাহায্যে বোঝা যাচ্ছে, “দৈনিক প্রথম আলো” পত্রিকায় প্রকাশিত আন্তর্জাতিক সংবাদের শতকরা ৫০% সংবাদই সংবাদসংস্থা এএফপি থেকে আসে। এবং বাকি ৫০% এর মধ্যে ২০ ভাগ আসে রয়টার্স থেকে, ২০ ভাগ আসে নিজস্ব প্রতিবেদক থেকে এবং বাকি ১০ ভাগ আসে অন্যান্য সংবাদমাধ্যম থেকে।   




ইংরেজি দৈনিক “New Age” পত্রিকার নির্বাচিত ৭ দিনের সংখ্যায় প্রকাশিত আন্তর্জাতিক সংবাদের সংখ্যা ও বিশ্লেষণ করা হল-

মোট সংবাদ = ৬৬টি

সংবাদ প্রতিবেদনের উৎস বিবেচনায় মোট সংবাদ প্রতিবেদনের সংখ্যা


এএফপি = ৪১ 
রয়টার্স = ১৫
এপি =  ০৮ 
অন্যান্য = ২


সংবাদ উৎস
বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত প্রতিবেদন
মোট প্রতিবেদন
শতকরা হিসাব
এএফপি
৪১
৬৬
৬২.১২ %
রয়টার্স
১৫
৬৬
২২.৭২ %
এপি
০৮
৬৬
১২.১২ %
পিটিআই
০২
৬৬
৩.০৩  %
নিজস্ব প্রতিবেদক
০০
৬৬
০ %










উপরোক্ত ছকের সাহায্যে বোঝা যাচ্ছে “New Age” পত্রিকায় প্রকাশিত আন্তর্জাতিক সংবাদের শতকরা ৮০% সংবাদই সংবাদসংস্থা এএফপি থেকে আসে। এবং বাকি ২০% সংবাদের মধ্যে রয়টার্স থেকে সিংহভাগ নেওয়া হয়।  









এই দুটি পত্রিকায় নিজস্ব প্রতিনিধি থেকে আসা সংবাদ ছিল মোট ১২টি, যার সবকয়টি এসেছে দৈনিক “প্রথম আলো” পত্রিকা থেকে। অর্থাৎ “New Age” পত্রিকায় নিজস্ব প্রতিনিধি থেকে আসা আন্তর্জাতিক সংবাদের সংখ্যা শুন্যের কোঠায়।







আর এই নিজস্ব প্রতিনিধি বলতে কোলকাতা, নয়াদিল্লী, প্যারিস, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য কিংবা নিউইয়র্কে থাকা বিশেষ প্রতিনিধিকে বোঝানো হয়েছে। ফলে নিজস্বতার স্বরূপ খুঁজে পাওয়া এখানে কষ্টসাধ্য।



সাম্রাজ্যবাদের জায়গা থেকে ভাবলে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক সংবাদের জন্য প্রথম আলোর মতো একটি জনপ্রিয় সংবাদপত্র অতিমাত্রায় নির্ভরশীল যা বাংলাদেশের সংবাদ প্রবাহের ক্ষেত্রে বিশেষ উদ্বেগজনক।

পশ্চিমা সংবাদ সংস্থার আধিপত্যের ফলে  আমরা কেবল জগতের খণ্ডিত, ঘোলাটে, একপেশে সংবাদই পাচ্ছি না বরং বিপুল সংবাদ পেলেও পাচ্ছি অতি নির্বাচিত সংবাদ। গুটিকয়েক সংবাদসংস্থার উপর নির্ভরতার কারণে আমাদের জগত হয়ে এসেছে ছোট ও সংকীর্ণ। 

পৃথিবীব্যাপী সংবাদ পরিবেশনে এপি, এএফপি, রয়টার্স -- এই তিনটি সংবাদসংস্থাই মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। সংবাদসংস্থা তিনটি পশ্চিমা -- যথাক্রমে আমেরিকান, ফরাসি ও ব্রিটিশ। ফলে আন্তর্জাতিক সংবাদগুলোতে একপাকি পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গি পরিবেশিত হয়। আমাদের সংবাদপত্রগুলো সেগুলো অনুবাদ করে দিয়েই দায়িত্ব শেষ হয়েছে বলে মনে করে। তাই আন্তর্জাতিক ইস্যুগুলোতে অর্থনৈতিকভাবে উন্নত, পশ্চিমা ও সাম্রাজ্যবাদী দেশের সরকার ও গণমাধ্যমের যে-মতামত পাওয়া যায়, আমাদের গণমাধ্যমেও সেই একই সুর শোনা যায়। টুইন টাওয়ারে হামলার পরে, আফগানিস্তানে যুদ্ধ শুরু হবার পরে ফক্স নিউজ চ্যানেল সংবাদের লেবেল ব্যবহার করেছে 'আমেরিকা আন্ডার এটাক', 'আমেরিকা এট ওয়্যার'আর আমাদের দেশের সংবাদপত্রেও দেখা গেছে সংবাদে ও অভিমত-কলামে 'আক্রান্ত আমেরিকা' লেবেল ব্যবহার করতে। পরে দেখা গেছে আফগানিস্তানে আমেরিকার যুদ্ধ কতটা নির্মম ও নিষ্ঠুর হয়েছে। পত্রিকাগুলো পরের দিকে নিজেরাও বুঝতে পেরেছে আফগানিস্তানে যুদ্ধের এবং এমনকি টুইন টাওয়ারে হামলার কারণও হয়তো অন্য কিছু। আন্তর্জাতিক সংবাদ-সংস্থার ওপরে অত্যাধিক নির্ভরশীলতার কারণে আমাদের সংবাদপত্রগুলোকে এমন দেখায় যেন তারা পশ্চিমা ও সাম্রাজ্যবাদী মতাদর্শের হয়ে কাজ করছে।

তৃতীয় বিশ্বের ও অপশ্চিমা একটি দেশ হিসেবে তৃতীয় বিশ্বের অন্য একটি দেশের সঙ্গেও আমাদের সাধারণ কিছু স্বার্থগত অবস্থানগত মিল রয়েছে। তাই তৃতীয় বিশ্বের কোনো মুসলিম বা অমুসলিম দেশের ওপরে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন হলে আমাদের মিডিয়ার ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত, তা স্পষ্ট বলে দেবার অপো রাখে না। কিন্তু আমাদের মিডিয়ার সংবাদ পরিবেশনের ধরন দেখে মনে হয়, তারা সাম্রাজ্যবাদের পক্ষেই সংবাদ পরিবেশন করছে। বিদেশী সংবাদসংস্থার ওপরে অতি নির্ভরশীলতার কারণেই এটা হয়ে থাকে।