এই ব্লগটি সন্ধান করুন

মঙ্গলবার, ২ মে, ২০১৭

ফেসবুক ও তরুণ সমাজ

ফেসবুক বর্তমান সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় একটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। মার্ক জাকারবার্গ নামের একজন তরুণ ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশেও এর জনপ্রিয়তা আকাশ চুম্বি। বিটিআরসির (BTRC) হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে ২০১৫ সালের আগস্টে ইন্টারনেট ব্যাবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি ৮ লাখ। আর ফেসবুক ব্যাবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি। প্রতি ১২ সেকেন্ডে একটি করে ফেসবুক একাউন্ট খোলা হচ্ছে যেটা বাংলাদেশের জন্মহারের চেয়েও বেশি। আর এর ব্যাবহারকারীর মধ্যে তরুণরাই সবচেয়ে বেশি।

ফেসবুক ব্যাবহারকারীর বেশীরভাগই সাধারণত পারস্পরিক যোগাযোগের জন্য ব্যাবহার করে থাকে। এছাড়া নিজের মত প্রকাশ, চিন্তা, মনের অবস্থা এসব কিছু ফেসবুকের মাধ্যমে তারা একে অপরের সাথে স্ট্যাটাসের মাধ্যমে শেয়ার করে থাকে। তরুণদের কাছে তাদের নিজেদের চিন্তা-ভাবনা তুলে ধরার জন্য ফেসবুক একটি সহজ মাধ্যম। প্রতিদিন তারা কোন ইস্যুকে প্রাধান্য দিচ্ছে তাও বোঝা যায় এই মাধ্যম থেকে। তাদের কোন মন্তব্য বা প্রচারণা ভাইরাল হয়, আবার কোন ভিডিও ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।

ফেসবুকের কারণে আজ যোগাযোগ অনেক সহজ হয়ে গেছে। তবে এর ব্যাবহারে যেমন ইতিবাচক দিক পাওয়া যাচ্ছে তেমন কিছু নেতিবাচক দিকও প্রায়শেই আমাদের সামনে আসে। যেহেতু তরুণ প্রজন্মের কাছে ফেসবুক বেশি জনপ্রিয় তাই এর প্রভাবও তাদের উপরেই বেশি দেখা যায়। ফেসবুক ব্যাবহারে নেতিবাচক দিক থেকে সবচেয়ে বেশি যেটি দেখা যায় তা হল অন্যের তথ্য দিয়ে ফেক আইডি খোলা এবং তা দিয়ে বিভিন্ন অপপ্রচার চালানো। অনেক সময় এই বিষয়টি এতোটাই ঘোলা হয় যে, যার তথ্য চুরি করে ফেক আইডি খোলা হয়েছে তাকে নানা ভাবে ব্ল্যাকমেইলও করা হয়।

ইন্টারনেট ব্যাবহারকারী সহজে নিজের পরিচয় গোপন রাখতে পারে বলে কাউকে হুমকি দেওয়া, ভুয়া সম্পর্কের ফাঁদে ফেলে টাকা হাতিয়ে নেওয়া অথবা প্রতিশোধ গ্রহনের জন্য ব্যাক্তিগত অন্তরঙ্গ মুহূর্তের দৃশ্য ধারণ করে ফেসবুকে ছড়িয়ে থাকে।

তরুণদের মধ্যে প্রায়ই দেখা যায় তারা ফেসবুকে অপরিচিত ব্যক্তির সাথে বন্ধুত্ব তৈরি করে। অনেক সময় এই বন্ধুত্ব এতোটাই গভীর হয়ে যে তা প্রেম থেকে শুরু করে বিয়ে পর্যন্ত গড়ায়। আর এতে অনেকেই প্রতারণার স্বীকারও হচ্ছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে আমরা প্রায়ই দেখি ফেসবুকে পরিচয় হওয়া ব্যক্তির সাথে বিয়ে করে প্রতারণার স্বীকার হওয়া।

সম্প্রতি ঢাকার উত্তরা এলাকায় এক কিশোর হত্যার ঘটনায় তরুণদের ফেসবুক ব্যাবহারে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে। তারা ফেসবুক পেজ খুলে গোড়ে তোলে নানা সন্ত্রাসী গ্রুপ। আবার ধানমন্ডিতে দুই তরুণের মারধর করার ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হলে তা সে সময় ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করে।

ফেসবুক প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ নিত্য নতুন ফিচার যুক্ত করছেন ফেসবুকে। ইদানিং যুক্ত হয়েছে লাইভ ভিডিও বা ফেসবুক লাইভ। আর এই সুবাদে যুক্ত হয়েছে প্রতারণার নতুন মাত্রাও। ফেসবুকে সরাসরি সপ্রচারের নামে দেখানো হচ্ছে পুরানো ভিডিও। আবার কখনো কখনো দেখা যায় এই ফেসবুক লাইভ ভিডিও তে যৌন সুড়সুড়ি বর্ধক অশ্লীল দৃশ্য, যা আমাদের যুব সমাজে ভয়াবহ যৌন উত্তেজনা সৃষ্টি করছে। আর এতে প্রতিনিয়ত ধ্বংস করে দিচ্ছে আমাদের তরুণ-তরুণীদের জীবন, ধসিয়ে দিচ্ছে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ভিত্তিমূল।

তবে এসবের বাইরে তরুণরা এখন পড়াশোনা, সমাজ সেবা, রক্তদান কর্মসূচি, সামাজিক ক্যাম্পেইন, সৃজনশীল কাজ এমনকি ব্যবসার জন্যও ফেসবুক ব্যাবহার করছে।

বর্তমান সময় ফেসবুক হল তরুণদের কাছে প্রতিবাদের এক অনন্য মাধ্যম। তরুণরা এখন আর সমাজে ঘটে যাওয়া নানা অপরাধ চোখমুখ বন্ধ করে সহ্য করে না। তারা ফেসবুকে বিভিন্ন পোস্টের মাধ্যম হোক কিংবা মন্তব্য করে হোক এমনকি সিটিজেন জার্নালিস্টের ভুমিকা পালন করেও অপরাধের দৃশ্য কিংবা অপরাধীর ছবি ফেসবুকে প্রকাশ করে প্রতিবাদ করে।

নারায়ণগঞ্জের শিক্ষক শ্যামলকান্তির অবমাননার দৃশ্য ফেসবুকে ভাইরাল হলে তা তরুণরাই প্রথম প্রতিবাদ করেছিল ফেসবুকে। আর এ থেকে বিষয়টি পরবর্তীতে মেইনস্ট্রিম মিডিয়াতেও স্থান পায়। এছাড়া তনু হত্যার বিচারের প্রতিবাদ, সিলেটি শিশু রাজন হত্যার বিচারের প্রতিবাদ এমনকি ঐতিহাসিক শাহাবাগের গণজাগরণ মঞ্চেও তরুণরা ফেসবুক ব্যাবহার করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তরুণদের নতুন এক প্রবণতা গড়ে উঠেছে আর তা হল ফেসবুক ব্লগিং। রাজনীতি, অর্থনীতি, সাহিত্য, খেলাধুলা, চলচ্চিত্র এবং বিভিন্ন সামাজিক বিষয় নিয়ে আগে তরুণরা যা ব্লগে লিখতো, তা এখন ফেসবুক স্ট্যাটাসেই লেখে। সেখানে অপরপক্ষ বিভিন্ন মন্তব্য করে এবং চলে নানা বিতর্ক।

আমাদের তরুণদের মাঝে লুকিয়ে আছে নানা প্রতিভা। অনেক সময় এই প্রতিভা তারা প্রকাশ করার মতো যথেষ্ট সুযোগ সুবিধা পায় না। তখন তারা নিজেরাই তাদের প্রতিভা সবার সামনে তুলে ধরতে চায়। আর এটি করতে তারা ব্যাবহার করে ফেসবুক। দেখা যায় অনেকে ভাল গান গাইতে পারে। কিন্তু তেমন সুযোগ না পাওয়ায় সে কখনই তার এই প্রতিভা সবার সামনে তুলে ধরতে পারে না। তখন সে ফেসবুকে তার নিজের গান শেয়ার করে কিংবা ফেসবুক লাইভে গান গেয়ে তার প্রতিভা সবার সামনে তুলে ধরছে। এভাবে ধীরে ধীরে সে হয়ে যায় একজন সেলিব্রেটি।

হিরো আলমকে আজ আমরা সবাই চিনি। কিন্তু মাত্র কিছু দিন আগেও এই তরুণ কে আমরা কেউই চিনতাম না। ফেসবুকে যখন তার অভিনীত নাটক বা গান ভাইরাল হল তখন ধীরে ধীরে আমরা সবাই তাকে চিনতে শুরু করলাম। আর এখন হিরো আলম হয়ে গেলো একজন সেলিব্রেটি।  

তাই দেখা যাচ্ছে ফেসবুক ব্যাবহারে তরুণদের জন্য তা শুধুমাত্র নেতিবাচক প্রভাবই বয়ে আনে না, বরং এর ব্যাবহারে অনেক ইতিবাচক দিকও পাওয়া যায়। অনেকে মনে করেন ফেসবুক বা ইন্টারনেট আমাদের তরুণ সমাজকে অবক্ষয়য়ের দিকে ধাবিত করে। তারা মনে করে তরুণরা ফেসবুক ব্যাবহার করে কত না খারাপ কিছু করে ফেলছে। কিন্তু এমন অনেক তরুণই আছে যারা ফেসবুকের ইতিবাচক দিকটাকেই নিজেদের জন্য নির্বাচন করে। তাই অবিভাবকদের উচিৎ তার সন্তান কোন দিকে যাচ্ছে সেই দিকটি যেন তারা লক্ষ্য রাখে।

কিছুদিন আগে শিক্ষার্থী ও তরুণ সমাজের মঙ্গলের জন্য রাতে ৬ ঘণ্টা  ফেসবুক বন্ধ রাখার চিন্তা করে বাংলাদেশ সরকার। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ক্ষতি ও তরুণদের কর্মদক্ষতায় বিরূপ প্রভাবের কথা চিন্তা করে এই সিদ্ধান্ত নিতে চেয়েছে আমাদের সরকার। কিন্তু রাতে ৬ ঘণ্টা ফেসবুক বন্ধ রাখলেই কি সব সমস্যার সমাধান হয়? বর্তমানে আমাদের দেশে ফেসবুক বেবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি। যার মধ্যে ৭০-৮০ শতাংশই হল তরুণসমাজ। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছে ফেসবুক এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকে নিজেদের প্রতিষ্ঠানের প্রচারণার জন্য কিংবা ব্যবসার জন্য এমনকি পড়াশোনা থেকে শুরু করে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজে ফেসবুককে ব্যাবহার করে। সবার জন্য তো আর সময় নির্ধারিত নয়। দেখা যায় কেউ তাদের এসব কাজ দিনেই করে থাকে আবার কেউ করছে রাতে। তাই তরুণ কিংবা শিক্ষার্থী যাদের জন্যই হোক রাতে ৬ ঘণ্টা ফেসবুক বন্ধ রাখা কোন ভাবেই সঠিক সিদ্ধান্ত নয় বলে আমি মনে করি।



































কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন